‘এরশাদের জামিন সাড়ে তিন বছরে, খালেদা কেন ছাড় পাবেন’

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার সাড়ে তিন বছর পর জামিন পেয়েছিলেন বলে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রশ্ন তুলেছেন খালেদা জিয়াকে কেন এত দ্রুত জামিন পাবেন।

রবিবার নিজ দপ্তরে এক ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা। এদিন দুপুরের পর বিএনপি প্রধানের জামিন আবেদনের শুনানি শেষে বিচারিক আদালতের নথি পাওয়ার পর সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে আপিল গ্রহণ করা হাইকোর্ট বেঞ্চ।

গত বৃহস্পতিবার আপিলের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে করা শুনানিতে ১৫ দিনের মধ্যে রায়ের নথিপত্র পাঠাতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। অর্থাৎ, জামিনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে এই সময় অবধি অপেক্ষা করতে হবে খালেদা জিয়াকে।

রবিবার বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের বেঞ্চে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

‘আদালতে আপনি কী বলেছেন’- জানতে চাইলে মাহবুবে আলম বলেন, ‘এর আগের একজন রাষ্ট্রপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছিল। সাড়ে তিন বছর পর তিনি জামিন পেয়েছেন। আরেকজন সরকারপ্রধান। তাহলে খালেদা জিয়াকে কেন ছাড় দেয়া হবে?’।

১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো এরশাদের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আরেকটা কথা বলেছি, সম্প্রতি ভারতে লালু প্রসাদ যাদবের জামিন আবেদন ঝারখান্ড আদালত নাকচ করেছে। তার সাজা মাত্র সাড়ে তিন বছর। রাজনীতিবিদরা যখন দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন, তখন সেই মামলায় কোন রকম অনুকম্পা দেখানোর কোন অবকাশ নাই।’

আসামিপক্ষ কী বলেছে- জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আসামিপক্ষ বলেছেন, উনি (খালেদা জিয়া) ৭৩ বছরের একজন মহিলা, নানা রকম অসুস্থ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারা তারা প্রয়োগ করতে চেয়েছেন।’

‘আমরা বলেছি, এখানে ৪৯৭ ধারা হবে না, এখানে ফৌজদারি কার্যবিধি ৪২৬ ধারা মতে হবে। তাছাড়া যেহেতু এটা দুর্নীতি দমনের মামলা ধরতেই হবে এটা নন-বেইলেবল অফেন্স (জামিনঅযোগ্য অপরাধ)।’

২০০৮ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলাটি করার পর রায় হতে লেগে যায় সাড়ে নয় বছরেরও বেশি। অ্যাটর্নি জেনারেল চান, উচ্চ আদালতে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।

‘এই মামলাটা নিম্ন আদালতের মতন এই আদালতেও দেরি করা হোক, ড্যাগ করা হোক আমি তা চাই না। আমি বলেছি, নিম্ন আদালতের নথিটা আসুক, সুপ্রিম কোর্টে অনেক মেশিন আছে অতি অল্প সময়ে পেপারবুক তৈরি করা হবে এবং পেপারবুক শুনানির পর মামলাটা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যাবে।’

‘আমি চাচ্ছি এই মামলাটি যাতে ঝুলে না থাকে মামলাটি যাতে হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হয়ে যায়।’

‘উনি জেলে আছেন, ওনাকে একজন সেবিকাও দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি, আদালত চাইলে জামিন না দিয়েই আমরা একমাসের মধ্যেই আপিল নিষ্পত্তি করতে পারব।’

খালেদা জিয়ার কোন যুক্তিতে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে সেটাও জানান মাহবুবে আলম। বলেন, ‘এই মামলার বিষয়ে আদালত ১৪ নম্বর সাক্ষী এবং মেটেরিয়াল এক্সিবিট-থ্রি বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে খালেদা জিয়া এবিষয়ে জানতেন, তিনি সামারিতে সই করেছেন এবং তার নির্দেশ মতেই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তার নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই এখান থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।’

‘সুতরাং তা ব্যাপারে বিচার্য বিষয় হল তিনি এসব জানতেন কি না, এটা তার হুকুমে হয়েছিল কি না। এবং তারপরে আমি বলেছিলাম এই মামলাটি নিম্ন আদালতে ঝুলিয়ে রাখার যে প্রক্রিয়া যে চেষ্টা করা হয়েছে সেটা থেকে অব্যহতি পাওয়া গেছে।’

‘আমি আরও বলেছি, এতিমের টাকা আত্মসাৎ করার চেয়ে বড় অপরাধ কিছু হতে পারে না। একজন সরকার প্রধান এই দায়িত্ব কোনভাবেই এড়াতে পারেন না।’

১৯৯১ সালে বিদেশ থেকে এতিমদের জন্য জন্য আসা দুই কোটি ১০ লাখেরও বেশি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই মামলা করেছিল দুদক। এতিম তহবিলের এই টাকা ১৯৯৩ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট করে তাতে স্থানান্তর করা হয়। সে সময় বগুড়ায় চার লাখ টাকায় জমিও কেনা হয়েছিল। কিন্তু আর কিছুই করা হয়নি। বরং ট্রাস্টের টাটা একাধিকবার ব্যক্তির নামে এফডিআর করা হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকে।

এই মামলায় খালেদা জিয়া ছাড়াও তার ছেলে তারেক রহমান, জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মনিনুর রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সলিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন এবং তৎকালীন মুখ্য সচিব কামালউদ্দিন সিদ্দিকীর কারাদণ্ড হয়েছে। খালেদা জিয়া ছাড়া অন্যদের কারাদণ্ড হয়েছে ১০ বছর।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেয়ার ১১ দিন পর বিচারিক আদালত থেকে পাওয়া যায় রায়ের কপি। পরদিন উচ্চ আদালতে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। ২২ ফেব্রুয়ারি সে আপিল গ্রহণ করে রবিবার জামিন আবেদনের শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ করে হাইকোর্ট বেঞ্চ।