জীবন ও প্রকৃতির কবি লুসি মাউড মন্টগোমেরি

কানাডার পূর্ব প্রান্তের ঐতিহাসিক প্রিন্স এডওয়ার্ড আইসল্যান্ডের সবুজ উপত্যকায় জন্মে ছিলেন বিশ্ব সাহিত্যের এক বিরল প্রতিভা। তিনি লেখিকা Lucy Maud Montgomery বা লুসি মাউড মন্টগোমেরি। কানাডিয়ান সাহিত্যিকদের মধ্যে লুসি মাউড মন্টগোমেরি একটি জনপ্রিয় নাম। আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য সমালোচক ও বিশ্লেষকদের ভাষায় তাঁর গ্রন্থ কানাডার ইতিহাসে সবচাইতে পঠিত গ্রন্থগুলির মধ্যে এককথায় অন্যতম।

লুসি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেন তার কালজয়ী গ্রন্থ সাহিত্য ‘আনা এন্ড দি গ্রীন গেবেল্স’ এর কারণে। এই গ্রন্থটির মূল প্রতিপাদ্য গড়ে উঠে কানাডার প্রিন্স এডওয়ার্ড আইসল্যান্ড এর পটভূমিকায় একটি অনাথ মেয়ে এনার বৈচিত্র্যময় জীবনকে ঘিরে। ছোট মেয়ে এনাকে এক ছেলে শিশুর পরিবর্তে ভুলবশত দুজন বয়োজেষ্ঠ্য সদস্য এক ভাই ও বোনের এক পরিবারে প্রেরণ করা হয়। এই পরিবারটি তাদের নিজ খামার ও ফার্মের কাজে সহায়তার জন্য একটি অনাথ ছেলে শিশুকে দত্তক নেবার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এই ছোট মেয়েটিকে পরিবারের সদস্যরূপে গ্রহণ করা হয়। গ্রীন গেবেলস গ্রন্থের সর্বত্রই ছোট এই মেয়ে আনা কীভাবে তার এই নতুন জীবন, পারিবারিক কাঠামোর সাথে খাপ খাইয়ে নেয় সেই বর্ণনার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এই উপন্যাসকে লেখিকা লুসির বাস্তবের যাপিত জীবনের একটি প্রতিফলন বলে অনেকেই বিবেচনা করেন।

বিশ্বসাহিত্যের এই কালজয়ী গ্রন্থের কেন্দ্রীয় চরিত্রের ‘এনা’ অনেকটা যেন বাধ্যতামূলকভাবে একাকিত্বের সাথে কিছুটা সমঝোতা করে তাঁর শৈশব অতিবাহিত করেন। বাস্তব জীবনে লেখিকা লুসি প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড এর নিউ লন্ডন অঞ্চলের ১৮৭৪ সনের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর দাদা প্রাদেশিক আইনসভার একজন উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। দুৰ্ভাগ্যবশত লুসির মা ক্লারা উলনের মাকনেইল ১৮৭৬ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে সালে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। লুসি তখন ছিলেন ২১ মাস বয়সের এক শিশু মাত্র। লেখিকা লুসি মড মন্টগোমেরি ছোটবেলা থেকে খুব কল্পনাবিলাসী এক সত্তা ছিলেন। পরবর্তীতে তার আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ ‘দি আলপইন পথ’ (১৯১৭), ‘দি স্টোরি অব মই ক্যারিয়ার’-এ তার স্বভাবসুলভ কল্পনা শক্তির আশ্রয় করে তার মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি খানিকটা এইভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি দেখেছেন তার মা কফিনে সমাহিত আর তিনি শুধুমাত্র একবার মায়ের শান্ত নিথর দেহে হাত বুলাচ্ছেন। তাঁর মুখে সেই হাত দিয়ে মার ত্বকের শীতল স্পর্শ ছাড়া আর কিছুই অনুভব করছেন না। (সংবাদ সূত্র, কানাডিয়ান এন্সিক্লোপেডিয়ার ও হিস্ট্রি ওয়েবসাইট ও আর্কাইভের ঐতিহাসিক গ্রন্থের তথ্য অনুসারে।)

মার অকাল মৃত্যুর পর তার বাবা তাকে তার নানা নানীর তত্ত্বাবধানে রেখে কানাডার উত্তর পশ্চিমের সাস্কাটুন অঞ্চলে নতুনভাবে সংসার স্থাপন করেন ও নির্দিষ্ট সময় পর তিনি দ্বিতীয় বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বাবার নতুনভাবে দ্বার পরিগ্রহ করার ফলে লেখিকাকে শৈশবে অনেক নানা টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

শিশু লুসি তাঁর বাবার নতুন পরিবারে এসে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করেন। কিন্তু সে পরিবেশে বিমাতার নেতিবাচক আচরণ তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের অনুকূলে ছিল না। তাই অবধারিতভাবে সেই পরিবারে তাঁর অবস্থান স্বল্পস্থায়ী হয়। এই পরিস্থিতিতে তার বাবা তাকে প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের ক্যাভেনডিশ অঞ্চলে তার নানা-নানীর কাছে স্থায়ীভাবে রেখে আসেন। সেখানেই লুসি বেড়ে ওঠেন। সামাজিকভাবে এই পরিবেশে যথেষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও তাঁর শিশুমনের চাহিদা অনুসারে পর্যাপ্ত উচ্ছলতা ও আনন্দময়তার উপস্থিতি এখানে মেলেনি। তাই স্নেহমায়া, প্রায় উচ্ছলতা আনন্দবিহীন বেশ কঠোর অনুশাসনময় জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এই একাকিত্ব থেকে একধরনের শূন্যতাবোধ শৈশবে তাঁর জীবনের অপরিহার্য সঙ্গীতে পরিণত হয়। সময় কাটানোর প্রয়াসে এক পৃথক আনন্দময় জগৎ সৃষ্টি করে তিনি ক্রমাগত লিখতেন। ছোটবেলা থেকে ক্রমাগত একাকী ভুবনে একান্ত এক বলয়ে তার চারপাশের প্রকৃতি থেকে কয়েকজন কাল্পনিক সঙ্গীকে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন। এই সময় বাড়ির খুব নিকটের একটি এক কক্ষ বিশিষ্ট স্কুলে গৃহে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

এই দিকটি সহজেই অনুমেয় যে কাল্পনিক একটি জগতের সুন্দর এক আবহ তৈরী করার যে সক্ষমতা তিনি দেখিয়েছিলেন সমগ্র জীবনভর সেটাই তার সৃষ্টিশীল রচনা, লেখনীর কর্মের অন্যতম সঙ্গী হয়েছিল। তবে মাঝে মধ্যে লুসির এই নিরবিচ্ছিন্ন অনেকটা নিরানন্দ শুন্যতার জীবনেও বেজে উঠতো আনন্দের সুর। এই আনন্দের উৎসমূলে ছিলেন মায়ের বোন এনি ক্যাম্পবেল ও তাঁর শিশু সন্তানের আনন্দময় সাহচর্য। তিনি প্রিন্স এডওয়ার্ড অঞ্চলের পার্ক কর্নার অঞ্চলে থাকতেন এবং লুসি তাঁদের বাড়িতে মাঝে মধ্যে বেড়াতে যেতেন। তার সন্তানদের হাসি, শিশুতোষ মজার জগৎ ও আনন্দময় সান্নিধ্য লুসির একাকিত্বের বোঝাকে অনেকটা মুক্ত করতে সাহায্য করে।

যেহেতু নানা ও নানী পরিবারের এই দুই অগ্রজ বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যের সংস্পর্শ তাঁর জন্যই খুব সুখময় অভিজ্ঞতা বয়ে আনেনি তাই এক অর্থে লেখালিখি ছিল তার জন্য এক শান্তির আশ্রয়। লুসির লেখালিখির সূচনা হয় খুব ছোটবেলা থেকে। নিজের সম্বন্ধে তিনি এক আলোচনায় বলেছিলেন ‘ঠিক কোন সময় থেকে আমি লিখছি তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়’। সকল সময় তিনি তার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন চিন্তাগুলি একটি ডায়েরিতে সংযোজনের চেষ্টা করতেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা ‘ও ক্রেপে লা ফোর্স’ প্রকাশ করেন। ১৮৯০ সালের প্রিন্স এডওয়ার্ড আইসল্যান্ডের পত্রিকা ‘শার্লট টাউন প্যাট্রিয়ট’। এই সময়ে অনেক ক্ষেত্রে রক্ষণশীল সমাজ কাঠামোয় তিনি নারী হিসেবে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবেন সেই বিষয়ে কিছুটা দ্বিধায় তিনি নিজ পরিচয় গোপন করে ছদ্মনামে লিখতেন। ১৮৮৪ সালে তিনি শার্লটটাউন এর প্রিন্স এডওয়ার্ড কলেজ থেকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপর একটি কোর্স সমাপ্ত করেন। অর্থনৈতিক সঙ্গতির অভাবে তিনি পরবর্তীতে হ্যালিফ্যাক্সের ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন একটি মহিলা কলেজ থেকে মাত্র এক বছর ইংরেজি সাহিত্য বিষয়ের উপর একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন।

১৮৯০ সালে তিনি প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডের (পি ই আই) বেলমন্ট ,বীডফোর্ড ও লোয়ার বেডউক অঞ্চলের স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এইসময়ে তাঁর নানার আকস্মিক মৃত্যুসংবাদে তিনি খুব দ্রুত ক্যাভেন্ডিশ অঞ্চলে প্রত্যাবর্তন করেন ও তাঁর নানীর রক্ষণেবেক্ষণের সকল ভার নেন। পরবর্তী তের বছরের বছর ক্যাভেন্ডিস অঞ্চলে অবস্থান করেন এবং এই সময় হ্যালিফ্যাক্স এ একটি পত্রিকা দি ডেইলি ইকো সংশোধক বাপ্রুফ রিডার পদে যোগদান করেন। এই সময় তিনি কানাডিয়ান ও পার্শ্ববর্তী অনেক কয়েকটি তার কবিতা আর লেখা পাঠাতে শুরু করেন। কয়েকটি স্থান থেকে তা একাধারে গৃহীত ইতিবাচক সাড়া মেলে এবং একাধারে প্রত্যাখাত হয়। অর্জন ও বর্জনের এই পথ পরিক্রমায় লেখালিখি থেকে এই সময় থেকেই তিনি সামান্য উপার্জন করা শুরু করেন।

১৯০৫ সালে তাঁর হাতে লিখিত একটি ডাইরির বিভিন্ন সময়ে লিখিত, সংযোজিত ধারণা অনুসারে করে তিনি ‘আনা এন্ড দি গ্রীন গেবেলস’ গ্রন্থটি রচনা কার্য সমাপ্ত করেন। আর দুঃখজনক প্রাথমিকভাবে তা বর্জন করেন বহু প্রকাশক। হতাশায় পর্যবাসিত হয়ে তিনি গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপিটি একান্তে সংরক্ষিত রাখেন। পরে ১৯০৮ সালে আবার নতুন উদ্যোমে গ্রন্থটি সংশোধন করেন। এই সময় আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের একটি প্রকাশনা থেকে তা প্রকাশিত হয়। এবার তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। প্রকাশনার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বইটি বিশ্বের সর্বাধিক বিক্রিত বই বা বেস্টসেলার বই এর তালিকার শীর্ষে চলে যায় এবং লুসি একজন জনপ্রিয় উপন্যাসিক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে বইটির কয়েক হাজার কপি বিক্রি হয় এবং প্রথম বছর প্রায় ২০ বার পুনঃপ্রকাশিত হয়। বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন ও কানাডিয়ান সাহিত্যিক ব্লিসকার্মান তাঁর এই গ্রন্থের জনপ্রিয়তার জন্য তাকে বিশেষ স্বীকৃতি সম্পন্ন ইতিবাচক মতামত দেন। প্রকাশকদের বিশেষ অনুরোধে গ্রীন গেবেলস গ্রন্থের প্রেক্ষাপটের সাথে সম্পর্কিত তিনি আরো দুটো রচনা করেন, ‘আনা অব এভনলে ও ‘আনা অব দি আইল্যান্ড’ (১৯১৫) নাম দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। এই প্রকাশনা থেকে আরো চারটি বই অনেকটা সমপর্যায়ের পরিপ্রেক্ষিত থেকে রচিত হয়। কিলমনি অফ দি অর্চার্ড, দি স্টোরি গার্ল, ক্রনিকলস অফ অভনলে ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

বাহ্যিকভাবে লুসি ছিলেন সুশ্রী মুখাবয়বের বুদ্ধিদীপ্ত চমৎকার এক ব্যক্তিত্ব। তাই খুব সহজেই তিনি সকলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। লুসির ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ বৈচিত্র্যময়। ষোড়শী লুসি নেট লকহার্ট নাম এক যুবকের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এরপর তার জীবনে প্রণয়সিক্ত হন কয়েকজন পুরুষ। স্নাতক পর্যায়ে তিনি এক শিক্ষক ও এরপর বান্ধবীর ভাই উইল প্রিটচার্ড এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বেডউইন সিম্পসন নামে তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সাথে সাময়িক সস্পর্কে আবদ্ধ হন এবং লোয়ার বেডেক অঞ্চলের এক কৃষক হারমান লেয়ার্ড এর সাথে স্বল্পস্থায়ী একটি রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। লেয়ার্ড পরবর্তীতে অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে সেই সম্পর্ক সফলতার আলো দেখেনি। ১৯১১ সালের তিনি রেভারেন্ড ইউয়ান ম্যাকডোনাল্ড এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে ইতোপূর্বে তিনি সকলের অজ্ঞাতে ১৯০৬ সাল থেকে তার সাথে একটি বিশেষ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

বিয়ের পর তারা অন্টারিওর লেকসডাল অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। এখানে তাঁর স্বামী ইউয়ান ম্যাকডোনাল্ড প্রেসবাইটারিয়ান চার্চের একজন মিনিস্টার এর দায়িত্বে স্থলাভিষিক্ত ছিলেন। সাংসারিক দায়িত্ব, আত্মীয় ও তার অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীদের সাথে সুন্দর সস্পর্ক বজায় রেখেতার সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করার চেষ্টা করেন। এই দম্পত্তি ম্যাকডোনাল্ড চেস্টার, হুগ্ আর স্টুয়ার্ট এর তিন সন্তানের পিতামাতা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। দুঃখজনকভাবে হুগ্ জন্মের সময় অকাল মৃত্যুবরণ করেন। এই শিশু সন্তানের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি কোনভাবেই সহজভাবে মেনেনিতে পারেননি। তার পরবর্তী অনেক রচনায় সন্তান হারানো অপরিসীম বেদনার দুর্বিষহ আর্তির দিকটি প্রকট রূপে লক্ষ্যণীয়।

এই সময়কালীন মন্টগোমেরির অনেক লেখায় ফুটে উঠেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ নির্মমতা, তার স্বামীর চার্চে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করার সময় নানা সামাজিকদ্বন্দ্ব, মানসিক জটিলতার বিশেষ কয়েকটি দিক। এছাড়াও সেই সময় এক আত্মীয়ের মৃত্যুতে তাঁর হৃদয়ে শব্দে ও ভাষায় গভীরভাবে রেখাপাত করে। ইতোপূর্বে উল্লেখ্য যে তার বিখ্যাত ‘আনা এন্ড গ্রীন গেবেলস’ প্রকাশিত হবার তা বিশ্বের শীর্ষ বিক্রিত বই এর তালিকায় বা বেস্ট সেলার বইয়ে পরিণত হয়। এই গ্রন্থ বিক্রির অর্থ থেকে কিছুটা রয়্যালটি পান আর সেই থেকে তার একটিবেশ ভালো উপার্জনের পথ সুগম হয়। যদিও গ্রন্থটির বিক্রির একটি বিরাট লভ্যাংশ চলে যায় প্রকাশনাটির হাতে। সংবাদ সূত্র অনুসারে এই বইতে পৃথিবীর প্রায় ৩৬ টি ভাষায় অনূদিত হয়। বিবিসি, কানাডিয়ান চ্যানেল সিবিসি এবং আমেরিকার কয়েকটি সম্প্রচার চ্যানেলে তার এই গ্রন্থের কাহিনীকে মূল উপজীব্য করে কয়েকটি চলচ্চিত্রও ধারাবাহিকভাবে শিশুতোষ এনিমেশন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে কানাডিয়ান প্ৰকাশনা থেকে এই বইটি প্রকাশিত হয়।

লুসি মোড মন্টগোমেরির আরো কয়েকটি উল্লেখ্যয় গ্রন্থ হলো Anne’s House of Dreams (1917), Rainbow Valley (1919), Rilla of Ingleside (1920), Anne of Windy Poplars (1936), Anne of Ingleside (193৯), এই সকল গ্রন্থে বিভিন্ন লেখায় স্পষ্ট ভাবে অনেক সময়হাস্যরসের সংযোগে তাঁর যৌবনের প্রিয় ও ভালোবাসার মানুষদের কথা পরোক্ষ প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও লুসির রচনায় এসেছে সন্তানের জীবনে মায়ের স্নেহময় উপস্থিতি ও ভূমিকা, মাতৃত্বের প্ৰয়োজনীয়তার কথা, মা হারা একজন অনাথ শিশুর মানবিক অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন চড়াই-উৎরাই, কল্পনার সঙ্গীর ও প্রকৃতির কাছে আশ্রয় খোঁজা, নারী হিসেবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বৈষম্য, সন্তান হারানোর হাহাকার, দারিদ্র, প্রেম ও ভাঙন, সামাজিক উৎসবের রূপ ইত্যাদি বিষয় তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে হৃদয়স্পর্শী, সাবলীল বর্ণনা ও আনন্দ বেদনার সমন্বয়ে বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর ছোটগল্প গ্রন্থগুলি হলো Chronicles of Avonlea (1912), Further Chronicles of Avonlea (1920),The Road to Yesterday (1974), The Doctor’s Sweetheart and Other Stories (1979),Akin to Anne: Tales of Other Orphans (1988), Along the Shore: Tales by the Sea (1989), Among the Shadows: Tales from the Darker Side (1990)After Many Days: Tales of Time Passed (1991), Against the Odds: Tales of Achievement (1993), At the Altar: Matrimonial Tales (1994), Across the Miles: Tales of Correspondence (1995), Christmas with Anne and Other Holiday Stories (1995).

প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড এর সবুজ উপত্যকা, প্রকৃতি, দুপাশের আটলান্টিক সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি, ক্যাভেনডিশ অঞ্চলের বর্ণিল ফার্ম যাসিলভার বুশ এই প্রতিরূপে তার রচনায় এসেছে, লোহিতবর্ণে মৃত্তিকা সুন্দর নান্দনিক বর্ণনা, নারীর অবস্থান, তার অনেক প্রিয়জনকে ঘিরে তাঁর স্বপ্নে অনেক না পাওয়ার বেদনা ইত্যাদি তাঁর সকল সাহিত্য প্রয়াসে চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে। লুসি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ২০ টি উপন্যাস দুটি ছোটগল্প গ্রন্থ সহ অসংখ্য প্রকাশনা কাজ সম্পাদন করেন। ১৯২৬ সালে তাঁরা স্বপরিবারে ওন্টারিওর নরভ্যাল এ চলে আসেন এবং এখানে তিনি তারস্বামীর কর্ম জীবনের অবসরপ্রাপ্তির সময় ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীতে তারা টরন্টো শহরে তাদের নতুন আবাস গড়েনএবং এখানেই ১৯৪২ সাল তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কালজয়ী এই সাহিত্যিককে তাঁর প্রিয় জন্মস্থান ক্যাভেন্ডিস অঞ্চলের সমাহিত করা হয়। টরন্টোতে তার শেষ বাসভবনের সন্নিকটে সরকারিভাবে একটি পার্কের নাম করা হয়। এছাড়া সাদা ও সবুজবর্ণের ছাদ সম্বলিত বিখ্যাত প্রিন্স এডওয়ার্ড আইসল্যান্ডের তাঁর ছেলেবেলার বাসভবনটি ন্যাশনাল হেরিটেজ বা ‘জাতীয় ঐতিহ্যের নিদর্শন’ হিসাবে সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

প্রতি বছরে সারা বিশ্বের অনেক পর্যটক, দর্শনার্থী তাঁর জন্মভূমিতে আসেন। লুসির জন্মদিনেও সারা বছর জুড়ে তার অনেক সাহিত্য অনুরাগীভক্ত এই বাসভবন সন্নিকটে ও প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড নানা সাংস্কৃতিক ও নাট্য উৎসবে যোগদান করেন। আনার রচনা, লেখার সরল সুন্দর আবেদন, হাস্যরস স্বপ্রতিভ সাহিত্য প্রতিভার মাধ্যমে কানাডায় প্রিন্স এডওয়ার্ড ওয়ার্ড আইসল্যান্ডকেও তাদের মানুষের জীবনধারা কৃষ্টি বিশ্বের দরবারে করেছেন সুপরিচিত।

লেখকের নিকট পরিজনদের থেকে জানা যায় মৃত্যুর পূর্বে তিনি কিছুটা বিষণ্ণতায় ভুগেছিলেন। কানাডিয়ান এন্সাইক্লোপেডিয়া ও হিস্ট্রি ওয়েবসাইট-এর তথ্য অনুসারে, তার মৃত্যু নিয়ে নানা বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। অনেকের মতে তিনি চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধ খুব বেশি মাত্রায় সেবন করেছিলেন। পূর্বেই আলোচনা করেছি লুসি সকল সময় তার হাতে লেখা একটি ডায়েরি নিজের সাথে রাখতেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত তিনিসেই অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন তার হাতের লিখিত অনেক চিঠি, কবিতা ও ডাইরীর অংশবিশেষ কানাডার গুয়েল্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ের তার নামে প্রতিষ্ঠিত একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। এছাড়ার তার জন্মভূমি প্রিন্স এডওয়ার্ড আইসল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামানুসারে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই সংক্রান্ত অনেক নথিপত্র সংরক্ষিত আছে।

সাহিত্যে তার অসামান্য অবদানের জন্যই ‘অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার’ ও ফ্রান্স এর লিটারারি এন্ড আর্টিস্টিক ইন্সিটিটিউর তার নামানুসারে বিশেষ সম্মাননা উত্থাপন করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি কানাডিয়ান সরকারের জাতীয় পর্যায়ের বিশেষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ‘পারসন অফন্যাশনাল সিগ্নিফিকেন্স’ এই সম্মানে সম্মানিত হন। কানাডা পোস্ট ১৯৭৫ সালে তার প্রতি বিশেষ সম্মানস্বরূপ একটি স্ট্যাম্প প্রকাশ করেন, পুনরায় ২০০৫ সালের তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বিশেষ সম্মান স্বরূপ কানাডার ডাক বিভাগ আরেকটি বিশেষ স্ট্যাম্প চালু করে। তার কাজের সম্মাননা হিসেবে ১৯২৩ সালে তিনি রয়েল সোসাইটি অফ আর্ট এর প্রথম মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালের টরন্টো স্টার পত্রিকা থেকে ‘কানাডার বিশিষ্ট নারী ব্যক্তিত্ব’ রূপে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করেন।

অনেক প্রতিকূলতা ও মানসিক টানাপোড়েনের সাথে সাথে সংগ্রাম করে গড়ে উঠা মানবতাবাদী ও নারী মুক্তির আদর্শে সক্রিয় এই নারী লেখককে একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে একধারার নারীবাদীরা কিছুটা নেতিবাচক ও একপেশেভাবে সমালোচিত করার প্রচেষ্টা করেছেন। কিন্তু চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি সময়ের চেয়ে আধুনিক ছিলেন এবং তা ছিল অনেক বিস্তৃত। একটি প্রতিকূল রক্ষণশীল পরিবেশে একজন অনাথ শিশু থেকে সফল নারী সাহিত্যিক রূপে বিকশিত হবার যে প্রত্যয়ী রূপ তিনি দেখিয়েছেন তা প্রকৃত পক্ষেই সার্বিক অর্থে শুদ্ধচিন্তার মুক্তিকামী নারী ও মানুষের কথা বলে। বাঁধা আর সীমাবদ্ধতা কে তিনি জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা তার চিন্তায় প্ৰতিধ্বনিত হয়েছে বারবার, কথায় ও কাজে বিন্যস্ত হয়েছে সামনে অগ্রসর হবার দৃপ্ত অঙ্গীকার। তিনি বলেছেন- ‘Well we all make mistakes, so put it behaind you. We regret our mistakes and learn from it, but never carry them forward into the future with us.” [লিখা: সংগৃহিত]