‘সুদূরে দিগন্ত’: বাংলার নারীর অবস্থান, স্থিতি ও নির্মোহ মূল্যায়ন

‘সুদূরে দিগন্ত’ নারী আন্দোলন কিংবা নারীমুক্তির ইতিহাস নয়। কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাসও নয়। ভাগ্যচক্রে পাগলী খালা তার হবু স্বামীর হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গের কোনো এক অজপাড়াগাঁ থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ফকিরচাদের গৃহে ঠাঁই নিয়েছিলেন, -এইটুকুই এই উপন্যাসের একমাত্র সত্য। এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক। এমনকি পাগলী খালার জীবনজুড়ে যে সকল পাত্র-পাত্রীর উপস্থিতি ঘটেছে বলতে গেলে তাদের প্রত্যেকেই লেখকের কল্পনায় গড়া। তবে পাগলী খালার সময়কে বোঝার নিমিত্তে এই উপন্যাসে বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক ক্ষণ এবং বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

গল্পে পাগলী খালা বর্তমান কাল হিসেবে নয় বরং কখনো বুড়ি আবার কখনো অরুন্ধুতির জবানিতে উপস্থিত হয়েছে এবং তাদের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। এ কারণেই পাঠককে কখনো উনিশ শতকের মধ্যভাগে কখনো বিশ শতকের শেষভাগে আবার কখনো বা একুশ শতকের দোরগোড়ায় দাঁড়াতে হবে বারংবার। আর এই সুপরিসর সময়ের সাথে চলতে চলতে পাঠকহৃদয়ে প্রশ্ন জাগতেই পারে শৈশব, কৈশোর, যৌবন এমনকি জীবনের শেষবেলা যে বার্ধক্য এইসব প্রতিটি ধাপে পাগলী খালা ও অরুন্ধুতির যে পথ পরিক্রমা তা লেখক কতৃক আরোপিত গল্পকথা নাকি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারীর জীবনে গ্রোথিত এক সত্যগাঁথা?

ইউরোপীয় সমাজে শিল্পবিপ্লব, ভারতীয় বাঙালি সমাজে ইংরেজি শিক্ষার বিস্তার আর বাংলার নবজাগরণ জ্ঞানীগুনী বিদগ্ধজনদেরকে নারীসমাজের দিকে ফিরে তাকানোর অবসর এনে দেয়। ইউরোপীয় শিল্পবিপ্লব আরবাংলার নবজাগরণ এই দুই দ্বৈরথ বিপ্লবের প্রভাবে বাঙালি সমাজের অবরুদ্ধ ভাবনার দুয়ার খুলে যায়। সেই ভাবনার দুয়ার খুলে সমাজ হিতৈষীজন ও সমাজ-সংস্কারকগণ যখন নারীর দিকে চোখ তুলে চায়লেন তখন তারা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলীণ্য প্রথা ইত্যাদি কুপ্রথা নারীকে কি নিদারুনভাবে শৃঙ্খলিত করে রেখেছে। তাঁরা আবিষ্কার করলেন সম্পত্তি-শিক্ষা-সুচিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিকারহীনতা নারীকে কিভাবে ঊনজন ব্রাত্যজনের অধিক করে রেখেছে।
শুরু হল নারীকে নিয়ে ভাবনার নতুন দিগন্ত। যদিও সে পথ কোনোক্রমেই মসৃণ ছিল না, দুঃসহ বাধা-বিপত্তিতে কণ্টকাকীর্ণ সে পথ। অতঃপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নারী যখন আজকের যুগে দাঁড়িয়েছে তখন দেখা গেল নারীর জীবনের বঞ্চনা-প্রবঞ্চনা তাকে পিছু ছাড়েনি। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে একুশ শতকের প্রথম ভাগে যে পার্থক্যটুকু দৃষ্টিগোচর হয়, উনিশ শতকের প্রতিটি নারী জীবনের সকল বঞ্চনাকে তার প্রাপ্য বলে ভেবেছে। একুশ শতকের কতিপয় নারী বঞ্চনাকে বঞ্চনা বলে ভাবতে পেরেছে। তাতে করে নারী মুক্তি লভেনি বরং তার সাথে যুক্ত হয়েছে নারীর ভিতর আরেক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

তাই তো বিশ শতকের পাগলী খালাকে সমাজের বৈরী-স্রোতের মুখে বুক উচিয়ে দাঁড়াতে গিয়েও যেমন বারংবার তার ভাগ্যের কাছে ফিরতে হয়েছে। তেমনি একুশ শতকে এসে অরুন্ধুতিকে সেই বৈরী স্রোতকে উপেক্ষা করতে গিয়ে, লড়তে গিয়ে এক ভিন্ন জীবন বেছে নিতে হয়েছে। পাগলী খালার জীবন যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে, অরুন্ধুতির পথচলা শুরু হয়েছে সেখান থেকেই।

হরিদাসী থেকে পাগলী খালা এবং পাগলী খালা থেকে অরুন্ধুতি। কিংবা উনিশ শতক থেকে একুশ শতক। নারীর সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে কতটা আর স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা হয়েছে কতটা, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা ‘সুদূরে দিগন্ত’।

কয়েক শতক আর কয়েক প্রজন্ম পেরিয়ে এই একুশ শতকের সূচনা পথে দাঁড়িয়ে প্রতিটি নারী কি খুঁজে পাবে তার গন্তব্য? ছুঁতে পারবে কি তার কাঙ্ক্ষিত দিগন্ত? নাকি দিগন্ত বলে কিছুই নেই নারীর জীবনে? এই প্রশ্ন পাঠকের কাছে তোলা রইলো।

লেখক পরিচিতি: মেহেরুন্নেছা রোজী
২০১৮ সালের বইমেলায় বেরিয়েছে ‘সুদূরে দিগন্ত’। প্রকাশক- দেশ পাবলিকেশন্স। বইয়ের মূল্য ৭০০ টাকা। পাওয়া যাচ্ছে ঢাকায় পাঠক সমাবেশ, বাতিঘর, পূর্বপশ্চিমে। আর চট্টগ্রামের বাতিঘর লাইব্রেরিতে।

জন্ম: ১৯৭৬। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যশোরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। দীর্ঘদিন একটি উন্নয়ন সংস্থায় উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। বইপড়া ও ভ্রমণ দারুণ পছন্দ করেন। সুদূরে দিগন্ত লেখকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। একমাত্র ছেলে অরণ্য পড়ছে অষ্টম শ্রেণিতে। রোজীর স্বামী মনিরুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।