সেখানে ইজ্জত হারানোর ভয় নেই

 

নাসিমা, মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে থাকে। গত আগস্টের কথা এদিক-ওদিক থেকে শুনতে পায় রোহিঙ্গা বসতি জ্বালানোর খবর। পাড়ার ছেড়ে সবাই পালাচ্ছে। নদী পেরোলেই নাকি অন্য দেশ। সেখানে নিজের ঘরবাড়ি না থাকতে পারে। কিন্তু সব সময় মরার ভয়, ইজ্জত হারানোর ভয় নেই।

আর সবার মতো নাসিমার স্বামী ফরিদ ঠিক করেছিলেন, তিনিও বৌ-বাচ্চা নিয়ে পালাবেন। সঙ্গে আরও কয়েক জন। সীমান্ত-সেনার চোখ এড়িয়ে কোথায়, কী ভাবে, কখন নৌকায় চড়তে হবে, সেই ট্রেনিং দেওয়া হয়ে গিয়েছে সবাইকে। শুধু বড় একটা বাক্স মাথায় নিয়েছেন ফরিদ। তাতে রয়েছে জামাকাপড়, শুকনো খাবার। আর একটা ছোট ব্যাগে জমানো টাকা, নাসিমার অল্প কিছু গয়না। আড়াই বছরের মুন্নাকে কোলে তুলে, চার বছরের মিনার হাত ধরে তাঁর সঙ্গে যাত্রা শুরু করলেন নাসিমাও।

নাফ নদী পেরোনোর জন্য যেই নৌকায় উঠতে যাবেন, মেয়ের কচি হাতটা মুঠো থেকে ছেড়ে গেল। অন্ধকার, ঠেলাঠেলি। এক বার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখারও সুযোগ নেই। ‘‘তবে পিছন থেকে কেউ যেন তখন হেঁকে বলেছিল— চিন্তা নেই, আমাদের নৌকায় তুলে নেব।’’

‘‘মা নাকি দুই সন্তানের মধ্যে তফাত করে না। তবু মুন্নার পাতেই কেন যে মাংসের শেষ টুকরোটা তুলে দিতাম, নিজেই বুঝতাম না। ছেলে হওয়ার পরে মেয়ের ওপর টান কি একটু কমে গিয়েছিল? না হলে বুকে আঁকড়ে রাখা ছেলেকে যতটা জোরে চেপে ধরেছিলাম, ঠিক ততটা জোরে কেন চেপে ধরিনি মিনার হাত?’’

সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারের কাছে উখিয়া শরণার্থী শিবির। প্রথম প্রথম দুঃসহ জীবনযাপন। রেশনের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার থেকেও লম্বা লাইন বাথরুমের সামনে। রোজ ভোরে সেই ঘিনঘিনে জায়গায় দাঁড়িয়ে গা গুলিয়ে ওঠে নাসিমার— ‘‘এখানেই আসার এত তাড়া ছিল যে, মেয়েটাকে খুঁজতে নৌকা থেকে এক বার নামলাম না?’’

ছবিটা ক্রমে পাল্টায়। ত্রাণ আসছে। বিদেশি স্বেচ্ছাসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে। মেয়েকে খুঁজতে সাহায্য করবে ওরা?

কারা যেন রোহিঙ্গা বাচ্চাদের জন্য স্কুল খুলেছে। সেখানে পড়ানোর কাজ পেলেন নাসিমা। সেই স্কুলেরই দরজায়, ফেব্রুয়ারির এক দুপুরে মিনার হাত ধরে এসে দাঁড়ালেন ফরিদের ফুফু। না, ভুল শোনেননি নাসিমা। সেই বৃদ্ধাই পিছন থেকে চিৎকার করেছিলেন, ‘‘চিন্তা নেই, আমাদের নৌকায় তুলে নেব।’’ নিয়েওছিলেন। গত ছ’মাস তিনিই আগলে রেখেছেন নাতনিকে। সে রাতে নৌকা পাননি ফুফু। বাংলাদেশে আসার সুযোগ পেতে কেটেছে ছ’মাস। কপাল ভাল। তাই এ পারে ঠাঁই মিলল যে শিবিরে, সেখানেই ডেরা বেঁধেছেন নাসিমা।

শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চিত ছাদের তলায় ঘুমন্ত দুই শিশুর মুখের দিকে চেয়ে গলার কাছটা দলা পাকিয়ে ওঠে নাসিমার। সে দিন মুন্নাকে বেশি জোরে চেপে ধরতে গিয়ে কি আলগা হয়ে গিয়েছিল মিনাকে ধরে রাখা তাঁর অন্য হাত?

উইমেন জার্নাল/আরএস