সিঙ্গেল মা মানেই অপরাধী?

উইমেনজার্নাল ডেস্ক, প্রকাশ: ২৭.০৫.২০১৮,সময়: ২১:৪৫মি:

অস্মিতা নতুন জায়গায় এসেছেন কয়েক দিন হল। নিজে চাকরি করেন। তাই মেয়ের দেখভালের জন্য সারা দিনের এক পরিচারিকাকে ঠিক করেছিলেন। কয়েক দিন কাজে আসার পরেই পরিচারিকা প্রশ্ন করেন, ‘‘আপা ভাইয়া নেই?’’ গৃহকর্ত্রী (অস্মিতা) জানিয়েছিলেন, না। ডিভোর্স হয়েছে তাঁর। ছোট মেয়েকে নিয়ে তিনি একাই থাকেন। পরিচারিকার উত্তর ছিল, ‘‘তা হলে আসব না আর!’’

এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। শুধু ঘটছে বলা ভুল, ক্রমাগত ঘটেই চলেছে। ‘সিঙ্গল মাদার’ বা একা মায়েরা যেখানে নিজেদের সন্তানদের নিয়ে প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়ছেন। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে পদে পদে যোগ হয়েছে বাস্তব সমস্যাও। স্কুলে ভর্তি থেকে ভিসার আবেদন— সব জায়গাতেই অনিবার্য হয়ে পড়ছে পিতৃ-পরিচয়।এই টানাপড়েনে ক্রমেই অনিশ্চিত আর ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে শিশুদের শৈশবকাল।

স্কুলে শিশুকে ভর্তি নেওয়ার আগে অভিভাবকদের যে সাক্ষাৎকার-পর্ব হয়, সেখানে বাচ্চার মাকে এমনও জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, কেন তিনি একা থাকেন বা কেন তিনি এ ভাবে মা হয়েছেন? কখনও আবার শিশুর পিতৃ-পরিচয় কী! যার সঙ্গে একটি শিশুর শিক্ষার অধিকারের কোনও রকম যোগসূত্রই নেই! অথচ, দিনের শেষে পিতৃ-পরিচয়ই প্রধান হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেকেই।আর বাবা কে? এই প্রশ্নে প্রতিনিয়ত বিব্রত হতে হচ্ছে মায়েদের।

সম্প্রতি ভারতে ঘটেছে এমন ঘটনা। সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সন্তান নেয়ার সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। আইভিএফ পদ্ধতিতে মা হয়েছেন টালিউডের চলচ্চিত্রকার অনিন্দিতা সর্বাধিকারী। অনিন্দিতা এখনও তাঁর ছেলেকে স্কুলে ভর্তির লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, অনলাইনে ফর্ম পূরণের সময়ে বাবার নাম ও ছবি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেটা না দেওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই ফর্ম বাতিল হয়ে যাচ্ছে। যেখানে নিজে গিয়ে ফর্ম তোলার সুযোগ রয়েছে, সেখানে ফর্ম তো পূরণ হল। কিন্তু তার পরে রয়েছে সাক্ষাৎকার-পর্ব। যে পর্বে শিশুর ভবিষ্যতের থেকেও বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বা পাচ্ছে একা মায়ের প্রসঙ্গটি। এমনকি, শিশুর যে কোনও বাবা নেই এবং সে আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্মেছে, এমন কথাও হলফনামা দিয়ে তাঁকে জমা দিতে বলা হয়েছে বলে জানাচ্ছেন অনিন্দিতা! তাঁর কথায়, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট যেখানে স্পষ্ট বলে দিয়েছে, মায়ের পরিচয়ই শিশুর জন্য যথেষ্ট, সেখানে প্রতিনিয়ত আমাকে লড়ে যেতে হচ্ছে। এটাই আমার জীবনের সব থেকে বড় লড়াই।’’

চিত্রশিল্পী ইলিনা বণিকেরও একই অভিজ্ঞতা। তিনিও আইভিএফ পদ্ধতিতে মা হয়েছেন। মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তার উপরে দক্ষিণ কলকাতার যে অভিজাত পাড়ায় তিনি থাকেন, সেখানেই সন্তানের পিতৃ-পরিচয় নিয়ে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ইলিনার কথায়, ‘‘সন্তানবাসনা বরাবরই ছিল। তাই ডিভোর্সের পরেও আইভিএফ পদ্ধতিতে মা হয়েছিলাম। কিন্তু তার পরেই বুঝতে পারি, সিঙ্গল মম নিয়ে যত বৈপ্লবিক আলোচনাই হোক, একা মা হওয়াটা এখনও যেন ভীষণ অপরাধের!’’ যদিও আইন স্পষ্ট করেই বলছে, শিশুর স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে মায়ের পরিচয়ই যথেষ্ট।

সমাজতত্ত্ববিদদের একাংশ বলছেন, আসলে আইনে অনেক কিছুই পাশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। কারণ, সামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে আইনসিদ্ধ বিষয়টির সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। একা মায়ের বিষয়টিও তেমন। তাই স্কুলে ভর্তি হোক বা পাসপোর্টের আবেদন, একা মায়েরা প্রতিনিয়তই সমস্যায় পড়েন। যতই আইন করা হোক, সমাজ অতটা এগোতে পারেনি বোধহয়।’’

 

উইমেনজার্নালবিডি/এজে