বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েশিক্ষার্থীদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা জরুরী

আতিকুল ইসলাম লিটন

আমরা ‘মাসিক’ শব্দটি বলতেই ভয় পাই। কিন্তু কেন? এটি মেয়েদের, নারীদের চিরায়ত একটি বিষয়। প্রত্যেক নারীর জীবনে দুটি ঘটনা আছে। একটি মেনারকি, অন্যটি মেনোপজ। মেনারকি হচ্ছে মাসিকের শুরু। আর মেনোপজ হচ্ছে মাসিক বন্ধ।

বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক পরিবর্তন আসে। এটা খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বিশেষ করে মেয়েদের মাসিক নিয়ে অনেক রাখঢাক আছে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সবাইকে ভাবতে হবে। এ বিষয়ে সচেতনতাই পারে মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের রোগ থেকে মুক্ত রাখতে এতে মানসিকভাবেও তারা ভালো থাকবে।

সাধারণত মাসিকের আলোচনা স্কুলের গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরের ধাপে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা তেমন হয় না বললেই চলে।তাই আজ এবার দেখা যাক উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে কতটুকু সচেতন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ মেয়েশিক্ষার্থীই গ্রাম থেকে আসা। ঋতুস্রাব বিষয়ে তাদের অনেক কিছু নতুনভাবে জানা দরকার হয় কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিকভাবে জেনে আসা বিষয়গুলোতেই তারা সীমাবদ্ধ থাকে। নানা সমস্যায় অন্যদের সাথে যোগাযোগে তাদেরও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। গ্রামের মতো শহরের মেয়েদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। তারাও পরিবারের বড়োদের কাছ থেকে যা শিখে আসে, তা-ই বুঝে থাকে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ জানাবোঝাকেই তারা যথেষ্ট মনে করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসেও তারা পুনরায় এ বিষয়ে কথা বলতে চায় না।

২০১৪ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের পলিসি সাপোর্ট ইউনিটের উদ্যোগে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় আইসিডিডিআরবি স্বাস্থ্য আচরণ বিধি বা হাইজিন ইস্যুতে  একটি জাতীয় সমীক্ষা পরিচালনা করেছে। এতে দেখা যায়, স্বাস্থ্য আচরণবিধি বা হাইজিন ইস্যুতে জাতীয় এ সমীক্ষা পরিচালনার সময় বিভিন্ন রকম আলোচনার মাধ্যমে মেয়েদের কাছ থেকে মাসিক বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বাসাবাড়িতে অবস্থানকারী নারীদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেয়েদের কাছে গিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে বলেছে, তাদের প্রথম যখন মাসিক হয়, তখন এ বিষয়ে তারা কিছুই জানত না। এ কারণে তাদের কাছে প্রথমে এটা একটা আতঙ্কের বিষয় মনে হয়েছিল। আলোচনায় দেখা গেছে মেয়েরা সাধারাণত তাদের বান্ধবী, সহপাঠী ও সহকর্মীদের কাছ থেকে মাসিকসহ শারীরিক বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কে প্রথম জানতে পেরেছে। প্রায় ৯৩ শতাংশ মেয়ে মাসিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তথ্য পেয়েছে তাদের মা, বোন, চাচি, দাদি বা নানির কাছ থেকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, এনজিওসহ অন্যান্য উৎস থেকে এ বিষয়ে তথ্য পেয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ মেয়ে।

সমীক্ষায় আরো দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে মাসিক সম্পর্কে না জানার জন্য বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়েছে। মেয়েদের অধিকাংশই পুরোনো কাপড় বা অন্য যেকোনো কাপড়ের কোনো অংশ মাসিক ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহার করে। নারীদের ২০ শতাংশ কেবল ঠিকমতো এটা পরিষ্কার করে। একই কাপড় বারবার ব্যবহার করে অনেকেই। এ কাপড়গুলো ঠিকমতো শুকানো হয় না। অনেক সময় স্বাস্থ্যসম্মত জায়গায় রাখা হয় না। এসব কারণে নানা ধরনের জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। এসব জীবাণু থেকে মেয়েরা বিভিন্ন রোগে ভুগে থাকে। শহর থেকে গ্রামে এ সমস্যা অনেক বেশি।

পাঠ্যপুস্তক খুঁজে দেখা যায়, মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত আলোচনা পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে করা হয়েছে।যেমন পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে সামান্য আলোচনা করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’ বইয়ে ‘আমাদের জীবনে বয়ঃসন্ধিকাল’ টাইটেলে ছেলেমেয়েদের কিশোর বয়সটাকেই বেশি তুলে ধরা হয়েছে। মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তেমন বড়ো আকারে আলোচনা নেই। সপ্তম শ্রেণির বইয়ে বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের ওপর মানসিক চাপ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে এবং অষ্টম শ্রেণিতে প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে এ বিষয়ে খুব বেশি আলোচনা নেই। কাজেই দেখা যাচ্ছে, প্রথমত, আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ঋতুকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, এ সংক্রান্ত তথ্য ও জ্ঞানের জন্য মেয়েদের তার ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হয়। দ্বিতীয়ত, আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মেয়েদের এ সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক সময় খুব ভালোভাবে জ্ঞান দেওয়া হয় না। আবার অনেক সময় ভুল ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। ফলে মেয়েরা প্রথম থেকেই অনেক অসচেতন থাকে, যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসেও অব্যাহত থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কার মেয়েদের এ বিষয়ে আলোচনায় খোলামেলা হবার ব্যাপারে সংকুচিত করে রাখে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০১৪ সাল থেকে প্রথমবারের মতো ‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’ বইয়ে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত করা হয়। প্রজনন ও স্বাস্থ্যশিক্ষা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এখনো অনেকটা নতুন এবং অনেকেই এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায় না। অনেকেই এ বিষয়ে জানতে চায় না বা তাদের জানার সুযোগও ঘটে না। আমাদের দেশে এখনো স্কুল স্তরে শিক্ষকরা বয়ঃসন্ধিকাল, প্রজননস্বাস্থ্যসেবা এমনকি মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনা ঠিকভাবে করেন না। এদিকে উত্তর-আমেরিকার স্কুলগুলোতে সোশ্যাল হাইজিন-সংক্রান্ত বিষয়ে ধারণা দেবার কার্যক্রম নেওয়া হলে দেখা যায়, এ বিষয়ে অনেকেই অজ্ঞ। ফলে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এসব ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়ে যায় উনিশ শতকের শেষের দিকে। এই কার্যক্রমে যুক্ত হয় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো, বিশেষ করে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য শিক্ষা।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে কায়রোতে ১৭৮ দেশের প্রতিনিধি সমন্বয়ে ‘জনসংখ্যা ও উন্নয়ন’বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা, নারীর প্রজনন অধিকারের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো কৈশোরে প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উঠে আসে।

পৃথিবীতে মানুষ আগমনের শুরু থেকে নারীদের এই প্রক্রিয়া চলে আসছে। তাই সবাইকে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে। কারণ, নারীর প্রজননস্বাস্থের জন্য সঠিক মাসিক ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি একটি বিষয়।একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসেও মেয়েরা তাদের ঋতুকালীন সমস্যা নিয়ে অসচেতন। পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অর্জিত এ সংক্রান্ত জ্ঞান এবং স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রাপ্ত তথ্যই মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও পর্যাপ্ত মনে করে। তারা কখনোই আরো বেশি জানার জন্য বই বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে না বা করতে চায় না। ফলে অধিকাংশ মেয়ে প্রায়ই বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে। এ বিষয়ে অবশ্যই মেয়েদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায়ও স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন এবং এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরও দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

সুতরাং উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মেয়েদের মাসিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। আর প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও বিশ্বদ্যিালয়গুলোতে এ সংক্রান্ত সহযোগিতা দিতে সরকার, দাতা সংস্থা সবাই মিলে একটি তহবিল করতে হবে। তবেই একদিন দূর হবে মাসিক নামের ভয়ংকর ভীতি।

এসএ/আইএল