মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা জরুরী

শাহানাজ পারভীন

একটি মেয়ের জন্মগ্রহণের পর থেকে ‘মাসিক’অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মাসিক বিষয়টি সম্পৃক্ত। অথচ তা উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। মাসিক কোনো রোগ নয়। এটি একটি প্রকৃতি-প্রদত্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যদি মাসিক বা ঋতু না থাকত মানুষ পৃথিবীতে আসত না। একটি গবেষনায় দেখা গেছে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মা প্রসবজনিত কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া গর্ভধারণ কালেও মারা যান অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে অসচেতনতাই এর প্রধান কারণ। আর এই সমস্যাটির শুরু হয় কিশোরী বয়স থেকেই। ওই বয়সে অস্বস্তি বা লজ্জার কারনে মাসিক চলাকালের অনেক সমস্যার কথা চেপে যায় নারীরা। এর ফলে জরায়ু সংক্রমণসহ নানা ধরনে জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন নারীরা। হতে পারে অকাল গর্ভপাতও।

এই ঋতুস্রাব বা মাসিক ইস্যুটি শুধু স্বাস্থসেবা, ন্যাপকিন প্যাড কিংবা স্যানিটেশনের সঙ্গেই জড়িত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকজন মেয়ের জীবন। সাংসারিক বাজেটে অনেক কিছুর সঙ্গে প্যাডের বাজেট থাকাও জরুরি। সাধারণত মাসিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে দেখা যায়না তবে গত কয়েক বছর ধরেই মেয়েদের স্বাস্থ্য সচেতনতায়  মে মাসের ২৮ তারিখ ‘মাসিক দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর থাকছে ভিন্ন ভিন্ন স্লোগান। এ ক্ষেত্রে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখতে পারে। মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন বিষয়টি কিন্তু মেনস্ট্রুয়াল হেলথেরই একটি অংশ। তাই হাইজিন বা স্বাস্থ্যসম্মত হওয়ার বিষয়টি যেন পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমেই হয়। সেটা কাপড় কিংবা প্যাড যে কোনোটি দিয়ে হতে পারে। যে মেয়েটি ঋতুকালে কাপড় ব্যবহার করছে তা পরিচ্ছন্নভাবে শুকানো, এর সঠিক ব্যবহার, প্যাড ব্যবহার করলে তা সাশ্রয়ী কিনা, কত সময় ধরে ব্যবহার করছে ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। নয়তো এতে রিপ্রোডাকটিভ সিস্টেম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই মূল বিষয় হলো পরিচ্ছন্নতা। যেমন একটা প্যাড ছয় ঘণ্টা পর পরিবর্তন করতে হয়। নানা কুসংস্কারে থেকে ৮৬ ভাগ মেয়ে স্কুল বা বাইরে থাকলে প্যাড পরিবর্তন করে না। তাকে মাসিকের সময় বিভিন্ন খাবারে নিষেধাজ্ঞা মানতে হয়। আবার এ সময় তাকে বাসার বাইরে বের হতে দেওয়া হয় না। পুকুরে গোসল করতে দেওয়া হয় না। এমন সব ভ্রান্ত ধারণা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সরকার ও একটি বেসরকাররি সংস্থার যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামে মাত্র নয় শতাংশ স্কুল ছাত্রী ও শহরে ২১ শতাংশ স্বাস্থ্যসম্মত প্যাড ব্যবহার করে। আর সামগ্রিকভাবে ৮৬ শতাংশ কিশোরী ব্যবহার করে পুরোনো, অপরিচ্ছন্ন কাপড়। গবেষণায় দেখো গেছে, নারীর ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এখনও সমাজে সেভাবে সচেনতনতা সৃষ্টি হয়নি। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা আলোচনার মানসিকতা এখনও আমাদের সমাজে তৈরি হয়নি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শহুরে সমাজ এই গোপনীয়তা থেকে কিছুটা বের হয়ে আসতে শুরু করলেও মফস্বল শহর ও গ্রামের ভাবনা পাল্টায়নি তেমন। এই অবস্থায় ঋতুকালীন পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা মূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে  স্যানিটারি উপকরণ সহজলভ্য করা এবং বিষয়টি নিয়ে পারিবারেও খোলামেলা আলোচনার পরামর্শও দিয়েছেন। দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ মেয়ে মাসিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে তথ্য পায় তাদের মা, বোন, চাচি, দাদি বা নানির কাছ থেকে। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, এনজিওসহ অন্যান্য উত্স থেকে এ বিষয়ে তথ্য পায় মাত্র ৬ শতাংশ মেয়ে। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মেয়ে মাসিক সম্পর্কে না জানার জন্য বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়েছে। তাদের অধিকাংশই পুরোনো কাপড় বা অন্য যেকোনো কাপড়ের কোনো অংশ মাসিক ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহার করে। একই কাপড় বারবার ব্যবহার করে অনেকেই। এ কাপড়গুলো ঠিকমতো শুকানো হয় না। অনেক সময় স্বাস্থ্যসম্মত জায়গায় রাখা হয় না। এসব কারণে নানা ধরনের জীবাণু সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। এসব জীবাণু থেকে মেয়েরা বিভিন্ন রোগে ভুগে থাকে।

আর একটি বিষয় আছে। সেটা হলো মেয়েদের পিরিয়ড বা মাসিকের সময়কে শরীর খারাপ বলে উপস্থাপন করা হয়। অথচ এটি সুস্থতার একটি চলমান অংশ। একে অসুস্থতা না বলে সঠিক নামে পরিচিত করা উচিত। তাই কেউ এ সময় নিজেকে অসুস্থ না বলে পিরিয়ড বা মাসিক চলছে বলতে পারে। অনেক সময় পিরিয়ডের উপসর্গকেও সমস্যা বলা হয়, একে কোনোভাবেই সমস্যা না বলে উপসর্গ বলার পক্ষে। তবে বিষয়টি যে এখস সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে এটা অনেক বড় ব্যাপার। তবে মনে রাখতে হবে, সমাজে সুস্থ নারীর পাশাপাশি অনেক ডিজঅ্যাবল নারীও রয়েছে। এজন্য সবাইকে নিয়েই কাজ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন একটা প্লাটফরম; যার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলেন, পরিবারের সদস্যদের বিশেষ করে মা এবং স্কুলের শিক্ষিকাদের এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হলে এ বিষয়টি নিয়ে মেয়ে শিশুদের মাঝে আতংক সুষ্টি হবে না।  স্যানিটেশন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাথরুমগুলোতে টিস্যু পেপার রাখার পাশাপাশি ডাস্টবিন ও পানির ব্যবস্থা রাখা দরকার। তারা বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাসের যে কোন একটি দিন স্বাস্থ্যবিষয়ে সচেতনতার জন্য একাধিক শিক্ষক ও চিকিৎসক এ বিষয়ে নানা ধারণা দিতে পারে।

মাসিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বস্তিসহ সমাজের সকল স্তরের পরিবারে স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে লিফলেট ও স্টীকার বিতরণ করতে পারে। এতে পরিবারে মা ও মেয়ের মধ্যে দ্বিধার যে দেয়াল তৈরি হয় তা দূর হতে পারে। মাসিকের বিষয়টি আড়ালে না রেখে খোলাখুলিভাবে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকাদেরকেও এ বিষয়ে নজরদারিত্ব বাড়াতে হবে। কেননা, শারীরিক অবস্থার ক্ষেত্রে বয়স ভেদে শিশু ৯ থেকে ১২ বছরের মধ্যে মাসিক শুরু হয়। শিক্ষকদের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে এটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আলোচনা করতে হবে।

বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তন হয়। এ সময় মেয়েটির পাশে মা-বাবার সহযোগিতার হাত বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিভাবক সমাবেশে মেয়েদের মাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করলে অভিভাবকরা মেয়েটির বিষয়ে আরও নমনীয় আচরণ করতে পারে। এতে মাসিক হওয়ার পর শিশুটির মাঝে কোন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হবে না। বিশেজ্ঞরা মনে করেন, পরিবারে ধর্মীয় সংস্কারের কারণে বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক পরিবর্তন এলে অভিভাবকেরা সন্তানদের সাথে এ সংক্রান্ত কোন কথা বলতে উৎসাহী হন না, বিম্ময়টিকে লুকিয়ে রাখতে চেষ্টা করেন। ফলে কিশোরী মেয়েটির যখন প্রথম মাসিক হয়, তখন তারা খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পরে। এসময় নানা সামাজিক সংস্কারের মধ্যে পরে মেয়েটি বিভিন্ন ভুল তথ্য পায, যা পরবর্তীতে তাদের বড় ধরণের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারে।

স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে মাসিক ব্যবস্থাপনা না করার কারণে এবং সচেতনতার অভাবে নারীরা  মাতুত্বের ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বড় ধরণের ঝুঁকিতে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাসিক সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে হেলাফেলা না করে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

সুতরাং মাসিক কোনো রোগ নয় বরং রিপ্রোডাকটিভ সিস্টেম বা জন্মধারা পদ্ধতির একটি প্রক্রিয়া। এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি সমাজে ট্যাবুতে পরিণত হয়েছে। ট্যাবু মানে হলো তথ্যের অভাব। যখন কোনো প্রচলিত নিয়ম বা সংস্কার ট্যাবুতে পরিণত হয় তার সঙ্গে কোনো না কোনো ভুল তথ্য জড়িয়ে যায়। নির্দিষ্ট কোনো সূত্র না থাকলে আমরা কখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না যে, কোনো একটি তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। মাসিককে জনস্বাস্থ্যের অন্তর্গত একটি বিষয় হিসেবে আমাদের আলোচনা করতে হবে। মাসিকের অব্যবস্থাপনার জন্য নারীদের প্রজননক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নারীরা নানা রোগে আক্রান্ত হন। তাই মাসিককে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা কর্মক্ষেত্রসহ সব জায়গায়  স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অনেকের দাবি আমাদের দেশে যে প্যাড কিনতে পাওয়া যায় তা তুলনামূলক দামি। সে ক্ষেত্রে যদি আমরা একটু সচেতন হই এর দাম হয়তো আরও কমানো সম্ভব হবে। কারন মানুষের আচরণ তখনই বদলায় যখন সে এটা নিজের মধ্যে নেয়। আর নেওয়াটা তার জ্ঞানের মধ্যে আসে শুধু দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে। যখন পরিবারে এর জন্য আলাদা বাজেট থাকবে তখন আর সমস্যা হবে না। অনেক স্কুল-কলেজে স্যানিটারি ব্যবস্থা থাকলেও তা ব্যবহারের অনুপযুক্ত। তাই সেদিকেও নজর দিতে হবে।

উইমেনজার্নাল/এসপি/এই