আবার এলো যে বৈশাখ

সাকিলা কামাল যুথী, উইমেনজার্নাল

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল, ৫.৩০ পিএম

আবার এলো যে বৈশাখ, এলো বাঙলা নববর্ষ…। নতুন দিনের নব উল্লাসে বাঙালীর জীবনে বৈশাখ ফিরে এসেছে বিভেদহীন সমাজ আর নব উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে। হাজার বছরের আবহমান বাংলার উৎসব বৈশাখ মানেই নতুনের আহবান। নব জাগরণের বার্তায় বৈশাখ বাঙালী জাতির উৎসব হিসেবে মহিমান্বিত করেছে তার আপন ঐতিহ্যে, বাংলাদেশের স্বকীয় সার্বজনীন উৎসব হিসেবে। কিন্তু বরাবরের বর্ণিল উৎসব এবার সম্পূর্ণ বিবর্ণ। এমন উৎসব বাঙালীর জীবনে আগে কখনই আসেনি।

গত ৮ মার্চ বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) তিনজন নভেল করোনা (কোভিড-১৯) ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে। এরপর থেকে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার এর মধ্যে যারা আগে থেকে স্থায়ী নানা রকম অসুখে অসুস্থ ছিলেন তাদের মধ্যে করোনাভাইরাসের প্রভাবে বেশকিছু রোগী মারাও গেছেন। প্রথম যেদিন বাংলাদেশে এই রোগ শনাক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে ঠিক সেই সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ উদযাপন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তের জোর প্রস্তুতি চলছিল। কালবিলম্ব না করে কয়েক বছর আগে থেকে পরিকল্পনা করা জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ব্যাপক লোকসমাগম করে যে অনুষ্ঠান আয়োজন করার কথা ছিল তা বাদ দেয়া হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদিসহ অন্য বিশ^ নেতাদের সেই অনুষ্ঠানে আসার পূর্ব পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়। অবশেষে গত ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে যতটুকু না করলেই নয় ততটুকুই আনুষ্ঠানিকতা করা হয়। সাংস্কৃতিক ও দেশী-বিদেশী অতিথিদের বক্তব্যমূলক অনুষ্ঠানের সব আয়োজন সরাসরির পরিবর্তে আগে থেকে ধারণ করে বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং দেশের সকল বেসরকারী টেলিভিশন ও প্রযুক্তি দুনিয়ার নানা মাধ্যমে প্রচার করা হয়।

বিশ্বব্যাপী অবনতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় ইতোমধ্যে যেন লোকসমাগম না হয়, মানুষকে কিভাবে ঘরে রাখা যায় এবং করোনা মোকাবেলায় অর্থনৈতিক পরিকল্পনাসহ নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাঠক একবার ভাবুন, কতটা ভয়াবহ দুর্যোগ হলে আগাম সতর্কতা হিসেবে এত পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে? দুনিয়ার খোঁজখবর রাখলে সহজেই তা অনুমান করা যায়। বাংলাদেশ বাঁচাতে হলে; দেশের মানুষ বাঁচাতে হলে আরও বেশ কিছুদিন বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত পন্থা ঘরে থাকার নীতি অবলম্বন করতেই হবে।

এই যখন সারা পৃথিবী ও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা তখন কী বাঙালীর চিরায়ত উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা সম্ভব? উত্তরটি নিঃসন্দেহে না। গত ৩১ মার্চ ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঝুঁকি এড়াতে পহেলা বৈশাখের সব অনুষ্ঠান না করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিকল্প ব্যবস্থায় ঘরে বসে প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎসব করার পরামর্শ দেন তিনি।

বাঙালী বরাবরই একে অপরের কাছে আসতে ভালবাসে। এমন জীবন ঘনিষ্ঠ আবেগ ও অনুভূতি সম্পন্ন জাতি পৃথিবীতে আর একটিও খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ যেখানে বিচ্ছিন্ন হতে হতে প্রত্যেকে একা হয়ে গেছে। সেখানে বাঙালীকে সেই অর্থে আলাদা করার মোক্ষম অস্ত্র এখনও আবিষ্কার হয়নি। বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালীর একটি প্রধান উৎসব। এটি ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে একে অপরের কাছে আসার অনন্য উৎসব। ধর্মীয় ক্ষেত্রে উৎসব পালনের একটি ভেদাভেদ থাকে। এই উৎসবে কোন ভেদাভেদ থাকে না। এই উৎসব হয়ে ওঠে সকল বাঙালীর। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, মুসলমান কিংবা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে কে আর এপারে কে বসবাস করে কিছুই বাদ সাধে না এই উৎসবে। সময়ের বিবেচনায় একদিন আগে পরে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খ-, অসম, ত্রীপুরা রাজ্যসহ সারা পৃথিবীতে বসবাসকারী প্রায় ৩৫ কোটি বাঙালী অভিন্ন প্রাণে মিলে এই উৎসব পালন করে থাকে।

আবহমানকাল থেকে বাংলা বর্ষবরণ উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির এক নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। কী গ্রাম, কী শহর সকালে ঘুম থেকে উঠে পান্তা ভাত খাওয়া উৎসবের একটি অংশ। বাড়িঘর পরিষ্কার করে সুন্দর করে সাজানো হয়। ধনী-গরিব প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সামর্থ্য অনুযায়ী বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা থাকে। গ্রামীণ বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে হালখাতা অনুষ্ঠান হতে দেখা যায়। দেশীয় শিল্পপণ্য, পিঠা-পুলির সম্ভার নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। গত ক’বছর যাবত ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে আয়োজন হয়ে আসছে বৈশাখী কনসার্ট। এবার বাংলাদেশসহ বিশে^র কোথাও এমন আনন্দ আয়োজনগুলো হবে না।

পকিস্তানের বাঙালী সংস্কৃতিবিরোধী দুঃসময়ে ১৯৬৭ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ঢাকার রমনা বটমূলে আয়োজিত হয়ে আসছে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বছরটি বাদে নিয়মিতভাবে চলেছে রাজধানীবাসীর পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রধান এ আয়োজনটি। ১৯৮৬ সালে যশোরে উৎপত্তি হয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন হয়ে আসছে, যা ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আয়োজকরা এবার প্রথমবারের মতো পহেলা বৈশাখে দেশের সবচেয়ে বড় এ দুটি আয়োজন বন্ধ ঘোষণা করেছে।

২০১৬ সাল থেকে সরকারী চাকরিজীবীদের জন্য বৈশাখী ভাতা চালু হয়। অনেক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানও এই ভাতা চালু করে। অর্থ যোগ হওয়ায় বাংলাদেশের মানুষের জীবনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। জামা-কাপড়, গহনা, জুতা, শোপিস, মিষ্টি-মিষ্টান্ন, ফুল, ইলিশ মাছ, মুদ্রণসামগ্রী ইত্যাদি ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশে একটি শক্তিশালী বৈশাখী অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। এই অর্থনীতির আকার কত বড় সে বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোন গবেষণা না হলেও এই খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে অনুমান করা যায় আকারটি ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার কম হবে না। উৎসব সংশ্লিষ্ট দোকানপাটে ২০ শতাংশ কেনাকাটা হয় পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। দুই ঈদ মিলিয়ে ৬০ শতাংশ এবং বাকিটা সারা বছরে হয়ে থাকে। এবারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের বৈশাখী অর্থনীতির চাকাও থেমে গেছে।

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে যত আয়োজনের কথাই বলি না কেন তার প্রতিটিই হয়ে থাকে মানুষে মানুষে কাছে আসার মধ্য দিয়ে ব্যাপক লোকসমাগম করে আনন্দ উল্লাস করার মাধ্যমে। আনন্দ উল্লাস করার মতো পরিস্থিতি এই মুহূর্তে নেই। যে দুর্যোগের মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি সে দুর্যোগ শুধুই মানুষ মানুষকে দূরে ঠেলে দিতে বাধ্য করছে। সাময়িক দূরে থাকার বিনিময়ে আমরা যেন আবারও কাছে আসতে পারি পহেলা বৈশাখের এই দিনে আমাদের সকল বাঙালীর সেটিই প্রত্যাশা থাকবে। পৃথিবীব্যাপী আজকে যে অন্ধকারের অমানিশা, অচিরেই সেই অন্ধকার পেরিয়ে আবারও আলো আসবে। পরাজিত হোক ভাইরাস নামক এক অশুভ শক্তির; জয় হোক মানুষের।

এসকেজেে/এজে